• শিরোনাম

    এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ

    শাহজাহান সিরাজ | মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 226 বার

    এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে  যাওয়ার পথে বাংলাদেশ

    মহামারি করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নির্দিষ্ট সময়েই ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় পৌঁছাবে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে দেশকে নিম্ন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

    সংস্থাটির কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) আগামী বছরের ফেব্রুয়ারীতে বিশেষ সভায় বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি দিতে সুপারিশ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। আগামী বছরের মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সমাপ্তিপর্বে দেশের মানুষকে এমন একটি সুসংবাদ দিতে চাইছে সরকার। কিন্তু এই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে তখন নতুন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে। তবে করোনায় অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এলডিসি হিসেবে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত সুযোগ-সুবিধা চাওয়া হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

    • ২০২৪ সালের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মিলবে এই মর্যাদা
    • এলডিসি হিসেবে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত সুযোগ-সুবিধা চাওয়া হবে
    • মার্চে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সমাপ্তিপর্বে দেশের মানুষকে এমন একটি সুসংবাদ দিতে চাইছে সরকার

    সূত্র জানায়,বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা মোকাবেলা করেই এলডিসি উত্তরণ করবে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। করোনার কারণে এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসা হয়নি। বরং এলডিসি হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা বহাল ছিল তা আগামী ১০ বছর বৃদ্ধি করে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত দাবি করবে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে এ বিষয়ে বাংলাদেশ তাদের অবস্থান তুলে ধরছে।। এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সুযোগ-সুবিধা পাবে। তবে এজন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে আপীল করার নিয়ম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

    এ প্রসঙ্গে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন,কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই নির্দিষ্ট সময় অর্থ্যাৎ ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কোনভাবেই পিছিয়ে যাওয়ার পক্ষে নই আমরা। বাংলাদেশ সব শর্ত পূরণ করেই ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে আমরা যেটা যাচ্ছি সেটা হল, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা যেন আরো ১০ থেকে ১২ বছর অব্যাহত রাখা হয়।

    তিনি আরো বলেন,করোনা পরিস্থিতি বেশ ভালভাবে সামাল দেয়া গেছে। তবে করোনার কারণে প্রথম তিন-চার মাস দেশের প্রায় সব কিছুই বন্ধ ছিল। ওই সমস্যাটি ছিল বিশ্বব্যাপী। পরে গত জুলাই থেকে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। এখন ভালভাবেই চলছে। ফলে অর্থনীতি বেশ ভালভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি।

    এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন,স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। যেমন-তখন শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে না। এতে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে ১২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। তাছাড়া বৈদেশিক ঋণে সহনীয় সুদ ও নমনীয় শর্তও সীমিত হয়ে আসবে। তাই সামনে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন তারা।

    এ বিষয়ে গত সোমবার অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, কোভিডের মধ্যেও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর যে অগ্রগামিতা, তাতে আশা করা যায়,বাংলাদেশ নির্দিষ্ট সময়েই অর্থ্যাৎ ২০২৪ সালের মধ্যেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করবে। আবার করোনাভাইরাসের প্রভাব ওই পর্যালোচনায় আমলে নাও নেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা যেন দীর্ঘ সময় অব্যাহত রাখা হয়,সে বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো দাবী রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

    তিনি আরো বলেন,এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ওই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই জোর প্রস্তুতি থাকতে হবে নিতে হবে বলে জানান তিনি।

    জানা যায়,জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে তিন ধরনের দেশ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বা এলডিসি। সংস্থাটি হিসেবটি করে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বা সঙ্কট সূচক অনুযায়ী। বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশসহ ৪৭টি দেশ এলডিসি হিসেবে রয়েছে। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ। এই মূল্যায়ন করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে অন্তত ছয় বছর লাগে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০২১ সালে চূড়ান্ত সুপারিশ পেলে নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মিলবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি। নিয়ম অনুযায়ী মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা-এই তিনটি সূচকের মধ্যে কমপক্ষে দু’টিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। এরপর আরো তিন বছর অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত অর্জনগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। পরে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এলডিসি তালিকা থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে অনুমোদন পেতে হবে। প্রতি তিন বছর পর পর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর একটি পর্যালোচনা করা হয়। মাথাপিছু আয়ের সূচকে নির্ধারিত মান হলো ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার। জাতিসংঘের দ্য কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) হিসাব অনুযায়ী,এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন হচ্ছে ১ হাজার ২৭২ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে উত্তরণের মান হলো ৬৬ বা তার বেশি। এ ক্ষেত্রে সিডিপির হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে আছে ৭২ দশমিক ৮। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচকে নির্ধারিত মান হচ্ছে ৩২। সিডিপির হিসাব অনুসারে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আছে ২৫। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশই প্রথম এলডিসি যে তিনটি সূচকেই শর্ত পূরণ করে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে।

    এদিকে,কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়লেও এখনও ভাল অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান সরকারের নানা ভিশনারী উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো অর্থনৈতিক মন্দায় খুব একটা সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন, রেমিটেন্স বৃদ্ধি, বড় বড় প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত থাকা, শিল্পের উৎপাদন সচল রাখা, রফতানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আর এ কারণেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে নির্দিষ্ট সময়েই বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। তবে স্বল্পোন্নত দেশের তার্লিকা থেকে বের হয়ে আসার পর অর্থনীতিতে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে দাতাদের কঠিন শর্তের মুখে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভাবমূর্তি উন্নয়নের ফলে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বহির্বিশ্বে জাতি হিসেবে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো উৎসাহী হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক দেশের সঙ্গে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া আগামী বছরের মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সমাপ্তিপর্বে দেশের মানুষকে এ ধরনের একটি সংবাদ দিতে চাইছে সরকার, যে কোভিড-১৯ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও সেটি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের সামনে উন্নয়ন সূচকগুলো তুলে ধরবে।

    জানা যায়,প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারও যাতে বাংলাদেশের অবস্থান ভালভাবে জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরা যায়, সে লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) জুয়েনা আজিজ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ফেব্রæয়ারিতে জাতিসংঘের পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণের আগ পর্যন্ত এলডিসি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে গৃহীত রোডম্যাপ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রতি মাসে সভা করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। একইসঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়গুলো কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সে সম্পর্কিত প্রতিবেদন টাস্কফোর্সের সভায় উপস্থাপন করা হবে।

    বাংলাদেশ সময়: ৮:৫৩ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০২০

    eurobarta24.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    প্রদীপ গ্রেফতার

    ০৬ আগস্ট ২০২০

    আর্কাইভ