• <div id="fb-root"></div>
    <script async defer crossorigin="anonymous" src="https://connect.facebook.net/en_GB/sdk.js#xfbml=1&version=v4.0&appId=540142279515364&autoLogAppEvents=1"></script>
  • শিরোনাম

    জুরিখে আক্কেল সেলামি

    ইয়াকুব আলী | ২২ আগস্ট ২০১৯ | ৯:২৫ অপরাহ্ণ

    জুরিখে আক্কেল সেলামি

    সুমন ভাই বললেন, ‘এয়ার বিএনবিতে বুকিং দেন। ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় বুকিং এজেন্ট। ফ্ল্যাটে থাকবেন। সস্তায়।’

    তাই নাকি? ট্রিপ এডভাইজার, বুকিং ডটকম, এগোডার কথা জানি। কিন্তু এয়ার বিএনবির নাম শুনিনি।

    ‘আরে ভাই, ইউরোপিয়ানরা কি পয়সা খরচ করে? সব ব্যাক-প্যাকার। ওদের এক নম্বর পছন্দ এয়ার বিএনবি। আপনারা তো মাত্র কয়েক ঘন্টা থাকবেন।’ সুমন ভাইয়ের কথায় চোখ চক চক করে উঠল। ইউরোপিয়ানদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকব কম পয়সায় ! সেই সাথে এ অছিলায় বাড়িওয়ালার সঙ্গে যদি খাতির হয়ে যায় মন্দ কী!

    সুমন ভাই মানে ফারুক নওয়াজ খান সুমন। আমার আপনজন। প্রবাসী সাংবাদিক। প্যারিসে থাকেন প্রায় ১০ বছর। সুমন ভাই বলেছিলেন তাঁর অনেক শিষ্য থাকে জুরিখে। একজনের সঙ্গে কয়েকবার ফোনে কথাও হয়। আমি ও আমার বস দুজনের জন্য জুরিখে রাতে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। বিকেল ৩ টার দিকে জুরিখ থেকে ভদ্রলোক সুমন ভাইকে জানিয়ে দেন যে ব্যস্ততার জন্য তিনি আমাদের থাকার কোন ব্যবস্থা করতে পারছেন না। দেশে ফেরার ফ্লাইট পরদিন সকাল ৯ টায় জুরিখ থেকে। প্যারিস থেকে জুরিখের দূরত্ব সাড়ে ছয়শ’ কিলোমিটার। ট্রেনের টিকেট আগেই কাটা ছিল। ট্রেন ছাড়বে বিকেল ৫ টা ২৩ মিনিটে। জুরিখ পৌঁছাবে রাত ৯ টা ২৬ মিনিটে।

    বিকাল তখন সাড়ে তিনটা। সুমন ভাইয়ের বাসা থেকে সোয়া চারটার মধ্যে বের হতে হবে। এ অবস্থায় মাথা ঠিক থাকে? জুরিখে রাতে থাকবো কোথায়? হোটেল খুঁজতে বুকিং ডটকমে সার্চ দিলাম। জুরিখ এয়ারপোর্টের আশেপাশে হোটেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ১২০ ডলার। এ অবস্থায় সুমন ভাইয়ের কথামতো এয়ার বিএনবি খুঁজলাম। দেখলাম মাত্র ৮১ ডলারে ‘ডিপোট-১৯৫’ নামের একটি হোস্টেল। ৮ সিটের শেয়ারড রুম। ব্যাক-প্যাকারদের হোস্টেল। বুকিং দিলে রুমে কেবল আমরাই থাকব। চোখ বন্ধ করে বসের ক্রেডিটকার্ড দিয়ে বুকিং দিয়ে দিলাম। দারুন একটা স্বস্তি! শেষ পর্যন্ত তাহলে ইউরোপে সস্তা কিছু পাওয়া গেল! সুইজারল্যান্ডের লোজান শহরে ফোর স্টার হোটেলে ছিলাম। ভাড়া ২৫০ থেকে ২৮০ ডলার। কিছুক্ষণের মধ্যে এয়ার বিএনবি হতে মেইল পেলাম। জানানো হলো রাত ১০ টার মধ্যে চেক ইন করতে হবে। ১০ টায় হোটেল রিসিপশন বন্ধ হয়ে যাবে। ভাবলাম: ব্যাপার না। ইউরোপের ট্রেন নিশ্চয়ই সময়মতো পৌঁছবে। আমরাও ১০টার মধ্যে হোটেলে পৌঁছে যাব।

    প্যারিসের গার দ্য লিও স্টেশনে ট্রেনে চড়ে বসলাম। অত্যাধুনিক ফ্রেঞ্চ ইলেকট্রিক ট্রেন-টিজিভি। ‘ফাসটেস্ট ট্রেন’ হিসেবেই এর পরিচিতি। প্যারিস শহর পার হওয়ার পর জানালা দিয়ে ফ্রান্সের গ্রামীণ অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য দেখতে লাগলাম। ইউরোপে এ সময় আটটা সাড়ে আটটার আগে সূর্য ডোবে না। দ্রুতগামী ট্রেন ধেয়ে চলছে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে মানববসতি। ছোট ছোট শহর। কখনো অরণ্য। বেশিরভাগই পতিত ভূমি। শত শত মাইল ফাঁকা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতর শঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করে। রাতের বেলায় যাচ্ছি! অপরিচিত জায়গায়! দ্রুতগতির ট্রেন এগিয়ে যায়। এক সময় সন্ধ্যা নামে। রাত হয়। ফ্রান্সের সীমানা পেরিয়ে সুইজারল্যান্ডের ভূখন্ডে ঢুকেছে অনেক আগেই। দিজো, বেলফোর-মনবেলিয়ার, মূলহাউজ, বাসেল পেরিয়ে জুরিখের কাছাকাছি পৌঁছে যায় ট্রেন। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে পরবর্তী স্টেশন জুরিখ এয়ারপোর্ট। আমাদের গন্তব্য সর্বশেষ স্টেশন। জুরিখ এইচবি। নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট পূর্বে জুরিখ মেইন স্টেশনে ট্রেন থামল। বিরাট এক স্টেশন। কনকনে ঠান্ডায় শরীর হিম হয়ে আসছে। আমার এমনিতেই ঠান্ডার সমস্যা! এই রাতের বেলায় প্রায় জনমানবহীন বিরাট এক রেলস্টেশন। সামনে এগুই স্টেশন থেকে বের হবো বলে। বসকে বললাম টয়লেটে যাব। প্রশ্রাব করতে। টেনশনে ট্রেনে বিষয়টি খেয়াল করিনি। বস বললেন তাঁরও একই অবস্থা।

    ‘টয়লেট খুঁজতে পারব না। এদিকেই মেরে দিব।’ বললেন বস।

    ‘স্যার এটি ইউরোপ! পুলিশে ধরবে।’ আমি বললাম।

    ‘রাখ তোমার ইউরোপ! অন্ধকার। নির্জন স্টেশন।’ বলে সত্যিই কয়েক কদম এগিয়ে একটি পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে রেললাইনের ওপর ঝেড়ে দিলেন। শেষতক আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম। ততক্ষণে রাত প্রায় ১০ টা। দ্রæতপদে বেরিয়ে এলাম বাইরে। শহরের কেন্দ্রস্থল। যাকে বলে হার্ট অব দি সিটি। শীতের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যেই বেরোলাম। শরীরে জুরিখ শহরের বাতাস লাগাবো বলে। আলো ঝলমলে শহর। সুন্দর সুন্দর বিপণিবিতান। রাস্তায় বড় বড় বাস চলছে। লোকজনের চলাচল আছে যথেষ্ট। জার্মান অধ্যুষিত শহর জুরিখ। শুনেছি সুইজারল্যান্ডের কোন শহর ফরাসি অধ্যুষিত, কোনটা জার্মান আবার কোনটা ইটালিয়ান সংস্কৃতি প্রভাবিত। ট্যাক্সিওয়ালাদের দিকে নজর দিলাম। নন-ইউরোপীয় চেহারার এক ড্রাইভার সম্ভবত: আফগানি তাকে পেয়ে আপন মনে হলো। ঠিকানা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘হোস্টেল: ডিপো ১৯৫’ যাবে কিনা। যাবে। ভাড়া ১২০ ফ্রাঁ। প্রায় ১২০ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ১০ হাজার টাকার বেশি। মাথায় হাত দিলাম! ভাড়া এত বেশি কেন? জায়গাটি কত দূরে তা জানতে চাইলাম। ড্রাইভার জানাল এখান থেকে হোটেল ২৮ কিলোমিটার দূরে । সর্বনাশ! তার মানে রাত কাটানোর জন্য আমাদের প্রায় ৩০০ ডলার খরচ হয়ে যাবে! ট্যাক্সিওয়ালাকে বলি, ট্যাক্সিতে যাব না। বাসে যাব। সে বলল, বাসে যাওয়া যায় না। লোকদেরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি আমাদের হোটেল যে এলাকায় সেখানে ট্রেনে যাওয়া যেতে পারে। তবে ট্রেনে চলাচল ও এক বিরাট ঝক্কি। মেশিনে টিকেট কাট। গন্তব্য স্টেশন ঠিকঠাক মতো টিপ। কচকচে স্ইুস ফ্রাঁ বা ইউরোর নোট ঢুকাও। টিকেট সংগ্রহ কর। ভাংতি বুঝে নাও। যাদের জানা আছে তাদের তো ব্যাপার না। আমরা তো কিছুই জানি না।

    এখানে ভাষাও ঠিকমতো বুঝি না। লোকজন জার্মান ভাষায় কথা বলে। শেষ পর্যন্ত দুই ছোকরাকে পেলাম। স্টেশনে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল। মনে হলো কলেজের ছাত্র। ওরা আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল। হোটেলের ঠিকানা মোতাবেক আমাদের গন্তব্য কোন স্টেশন, কোথায় কিভাবে টিকেট কাটতে হবে বুঝিয়ে দিল। মেশিনে আমরা পারব না ভেবে শেষ পর্যন্ত ওরাই আমাদের টিকেট কেটে দিল। সেই সঙ্গে কোথায় ট্রেনে উঠতে হবে তাও বলে দিল। আমাদের ভাবসাব দেখে ধরে নিল আমরা কিছ্ইু বুঝি নি। তখন ওরা এসকেলেটর বেয়ে নিচে নিয়ে গেল আমাদের যথাযথ প্লাটফর্মে। অনেক ধন্যবাদ দিয়ে তাদের ফেরত পাঠালাম।

    ১৫/২০ মিনিট অপেক্ষার পর আমাদের নির্ধারিত ট্রেন এল। ট্রেনে উঠলাম। মনে হচ্ছিল আমাদের গন্তব্যের উল্টোদিকে যাচ্ছে ট্রেন। কিন্তু না। জুরিখ এয়ারপোর্ট পার হচ্ছে দেখে বুঝলাম ট্রেন ঠিকভাবেই যাচ্ছে। তার পরের স্টেশনই আমাদের গন্তব্য।

    স্টেশনের নাম উইনটারথার। জার্মান অধ্যুষিত শিল্প এলাকা। রাত সাড়ে এগারটার দিকে ট্রেন থেকে নেমে ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিওয়ালা আফগান। টুকটাক ইংরেজিতে কথা হলো। ৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম হোস্টেলের সামনে। বিল্ডিংয়ের দেয়ালে ওপরে বড় করে লেখা ‘ডিপোট-১৯৫’। সুনসান নীরবতা। গেট কোন দিকে খুঁজে পেলাম না। রেস্টুরেন্ট ভেবে পাশের বিল্ডিংয়ে গেলাম। দেখলাম রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে হোস্টেলের গেট কোনদিকে তা ওরা দেখিয়ে দিল। ট্যাক্সি ভাড়া সাড়ে বার ফ্রাঁ। ওকে ১৩ ফ্রা দিতে হলো ভাংতি নেই বলে। ট্যাক্সিওয়ালাকে ছাড়লাম না। পয়সা বেশি দিয়েছি। প্রয়োজনে যেন ওর মোবাইল থেকে একটি কল করতে পারি। ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের হয়ে হোস্টেলের কলিংবেল চাপল। নো রেসপন্স! হতাশ হয়ে পড়লাম। ক্ষুধায় অস্থির। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। কেউ কোথাও নেই। প্রচন্ড শীত। আবার টিপটিপ বৃষ্টিও হচ্ছে। কী করব! বস বললেন কি হোটেল ঠিক করলা যে শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে লাশ হতে হবে! এর চেয়ে ভালো ছিল রাতটা এয়ারপোর্টে বসে কাটিয়ে দিলে। ভাড়াও দিতে হতো না। চল তার চেয়ে এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে থাকি!

    বসকে কীভাবে বোঝাই যে, ইউরোপিয়ান এয়ারপোর্ট তো আমাদের কমলাপুর স্টেশন নয়। মুখে বললাম ‘স্যার, অভিজ্ঞতা তো হচ্ছে।’ এমন সময় নজরে এলো খামের মতো একটা কিছু গেটে ঝুলছে। কাছে গিয়ে দেখলাম লেখা আছে ‘টু /আলী /ওয়াই.’। স্কচটেপ দিয়ে আটকানো ঝুলন্ত এ-ফোর সাইজের ভাজ করা কাগজটা খুলে দেখলাম আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা বার্তা যার মানে দাঁড়ায় ‘আলী, আপনাকে স্বাগতম। ইমেইল বা ফোনে আপনাকে পাইনি। রাত ১০ টার মধ্যে চেক-ইন করার কথা ছিল। তবে বিলম্বে চেক-ইনের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নির্দেশনা জানতে আপনার মেইল চেক করুন। আমাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড হলো: ‘ডিপোটনেট’। জরুরি প্রয়োজনে আমাদের নৈশকালীন কন্টাক্ট ৩২৫১৩১৯৬৪ ।’ উত্তম শ্রদ্ধান্তে স্টাফ, ডিপোট ১৯৫। সাথে সাথে ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে কানেক্টেড হয়ে গেলাম। শেষে ট্যাক্সিওয়ালার মোবাইল থেকে নিশুতি নম্বরে কল দিলাম। মনে হলো অপর প্রান্তের রিসিপশনিস্ট আমেরিকায় বসে কথা বলছে। যাহোক তার কাছ থেকে জানতে পারলাম গেটের পাশে লেটার বক্সের মতো অনেকগুলো বক্স আছে। আমার বক্স নম্বর ৪। সেই বক্সে রক্ষিত কাগজে লেখা আছে মেইন গেট খোলার পাসওয়ার্ড। অটোলকে পাসওয়ার্ডের নম্বর ঘুরিয়ে গেট খুলতে পারলে যেতে হবে রিসিপশনে। সেখানে নির্ধারিত জায়গায় আছে রুমের চাবি। নিশুতির কথা কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে দুশ্চিন্তায় প্রচন্ড শীতেও ঘেমে উঠলাম। যাহোক দৈবক্রমে এগুলো সব ঠিকঠাকভাবে সেরে দোতলায় রুমে ঢুকতে সক্ষম হলাম। বিশাল রুম। ৪ টি দোতলা খাট। ৮টি চিৎকাত বেড। রুমেম ৮ জন থাকতে পারে। আমরা লোক মোটে দুইজন। পুরোটাই খালি। প্রচন্ড ক্ষুধায় অদ্ভুতুড়ে বিছানায় মনে হলো কবরে শুয়ে আছি। নতুন দুশ্চিন্তা ভর করছে। ঘুমিয়ে পড়লে ডেকে দেবে কে? ভোরে চেক আউটই বা হব কিভাবে? ছয়টার মধ্যে বের হওয়া উচিত। ততক্ষণে কেউ থাকবে না রিসিপশনে। অটো সিস্টেমে যদি গেট খুলতে না পারি!

    এয়ারপোর্টের কাছের কমদামি হোটেলে থাকলে হয়তো বড়জোর ১২০ ডলার খরচ পড়তো। কয়টা ডলার সাশ্রয় করতে শহর থেকে দূরের এক হোস্টেলে রাত কাটাতে গিয়ে ট্রেনের টিকেট, ট্যাক্সি ভাড়াসহ আমাদের খরচ ২৫০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। শীতের রাতে কাকভেজা হওয়া এবং উপোস করে নির্ঘুম রাত কাটানোর অভিজ্ঞতাটাই বাড়তি পাওনা।

    লেখক: পরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, বাংলাদেশ।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০