• শিরোনাম

    পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মরা আদিবাসী নাকি উপজাতি এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের তাৎপর্য

    মেকসুয়েল চাকমা | মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 115 বার

    পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মরা আদিবাসী নাকি উপজাতি এবং আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের তাৎপর্য

    বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে দেশের মোট আয়তনের দশ ভাগের একভাগ অঞ্চল নিয়ে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। জনসংখ্যায় বৃহৎ বাঙ্গালি জাতির পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলায় ১৩ টি ভাষাভাষির ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তার বসবাস। কিন্তু বলাবাহুল্য ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তাদের মাঝে জাতি গঠনের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকা স্বত্তেও বাংলাদেশ সরকার এখনো সাংবিধানিকভাবে এ জাতিবৃন্দকে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সরকার সংবিধানে বিগত ১৫তম সংশোধনীতে ২৩ক অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ- গোষ্ঠী হিসেবে। যেটা জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাতে বলা আছে- প্রত্যেক মানুষ বা সম্প্রদায় নিজেদেরকে সংগঠিত করে একতাবদ্ধ হয়ে তাদের পরিচয় দিতে পারবে। এটা তাদের মানুষ হিসেবে অধিকার। তদ্রুপ সমতল ও পাহাড় মিলে মোটে ৪৫ টির মতো এথনিক জাতিসত্তারা সরকার যাতে তাদেরকে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি দেয় সে যৌক্তিক দাবী করেছিলো। কিন্তু সরকার সবকিছু বুঝেও আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ব বজায় রেখে জাতিসত্তাদের মৌলিক দাবিটুকু স্বীকৃতি না দিয়ে জোর করে বা কৌশলে সংবিধানে স্বীকৃতি দিলো উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, বা নৃ-গোষ্ঠী।

    তাহলে এবার জানা যাক আদিবাসী অর্থ – “শব্দের অর্থটি পর্যালোচনা করলে পাওয়া যাবে ‘আদি’ মানে প্রাচীন, আদিম বা প্রান্তিক, আর ‘বাসী’ মানে নাগরিক জনসমষ্টি বা জনমানব। তার মানে আদিবাসী শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- আদিকাল হতে যে জনসমষ্টি একই এলাকায় প্রান্তিক ও স্বকীয় অবস্থানে থেকে বসবাস করে চলেছে তারাই আদিবাসী।”

    এবার জেনে নেয়া যাক উপজাতি শব্দের অর্থ- “শব্দের অর্থ পর্যালোচনা করলে পাওয়া যাবে ‘উপ’ মানে শাখা, আর ‘জাতি’ মানে জনসমষ্টি (যারা নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করে)। তার মানে উপজাতি হচ্ছে কোন জাতির শাখা বা অন্যজাতি থেকে উৎপত্তি জনসমষ্টি।”

    এবার দেখুন “আদিবাসী” শব্দের ইংরেজি Indigenous meaning টা “Indigenous communities, peoples, and nations are those that, having a historical continuity with pre-invasion and pre-colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of societies now prevailing in those teritories, or parts of them.” (Source: wikipedia) এবং এই meaning টি United Nation, ILO স্বীকৃতি দিয়েছে।

    আরো দেখুন “উপজাতি” শব্দের ইংরেজি Tribe meaning টা ” Tribe is a group of distinct people, dependent on their land for their livelihood, who are largely self-sufficient, and not integrated into the national society. It is perhaps the term most readily understood and used by the general public. (Source- Wikipedia)
    মূলত উপরের দুটি ইংরেজি শব্দ “Indigenous and Tribe” meaning অনেকটা একই বা পরিপূরক। যা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩ টি এথনিক জাতিসত্তাদের অতীত এবং বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে পরিপূর্ণভাবে মিলে যায়। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এথনিক অধিবাসীরা পাহাড়ে বসবাস করে চলেছে সেই ১৫৪৬ সাল থেকে; যাদের রয়েছে ঐতিহাসিক পথভূমি, নিজস্ব সঙ্কৃতি, প্রথা-রীতি, বর্ণমালা, ভাষা, লোকগাথা ইত্যাদি যেগুলোর চর্চা আজ অবধি প্রতীয়মান এবং তারা রাজা(Chief) বা সমষ্টিগত গোত্র প্রধান (Circle Chief) দ্বারা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে শতশত বছর যাবৎ প্রথাগতভাবে শাসিত। অতএব পার্বত্য চট্টগ্রামের এথনিক জনজাতিদের নির্দিধায় বলা যায় ইংরেজিতে Indigenous বা Tribe. যা বাংলায় কোনমতেই উপজাতি নয়।
    তাহলে এখন সমস্যাটা কোন জায়গায়?- সমস্যা হলো বাংলাদেশের অনুবাদকারক, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনিক আমলাওয়ালা সাম্প্রদায়িক মানুষদের। যারা নিজেদের অবস্থান সবসময় জটিল সব লালফিতায় আবদ্ধ করে রাখতে পছন্দ করেন। এমনকি দেখা যায় প্রতিটা আইন তৈরিতে তারা জটিলতার প্যাচ পাকিয়ে রাখেন।

    আজকে যদি ইংরেজি Indigenous এর অর্থ বাংলায়ও “ইন্ডিজিনাস” বা ইংরেজি Tribe এর অর্থ বাংলায়ও “ট্রাইব” হতো তাহলে কোন সমস্যা ছিলোনা। কারণ যত সমস্যা এখন বাসা বেধেছে বাংলাই সেই- “অাদি” ও “উপ” দুটি শব্দে। আদি নিয়ে গঠিত “আদিবাসী” শব্দটি একটা উৎকৃষ্ট সম্বোধন ব্যবহার, যা দেশে বৃহৎ বাঙ্গালি জাতি অনেকে মনে করে। সেটা অন্য জাতি ব্যবহার করুক তারা তা অধিকাংশজনে চায় না। অনেকে আবার আক্ষেপ করে এটাও বলে আমরা বাঙ্গালিরাই “আদিবাসী”। তার একধাপ উপরে সেটেলার বাঙালীদের ব্যানারসমেত ক্যাম্পেইনই। তারা বলছে- ‘উপজাতীয়রা নয়, বাঙালিরাই আদিবাসী’ (দেখুন দ্বিতীয় ছবি)। তবে সেটেলাররা যে খাস উপ-জাতি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর কতটা উগ্র বা সাম্প্রদায়িক মনমানসিকতার হলে অধিকারহীন, প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘনের শিকার জুম্ম এথনিক জাতিদের সাথে সমঅধিকার দাবির নামধারী সেটেলার বাঙ্গালিরা এইসব করতে পারে তা অবশ্য অনুমান করা যায়।

    আর অন্যদিকে “উপ” দিয়ে সৃষ্টি উপজাতি শব্দটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিম অধিবাসীরা ব্যবহার করতে সম্পূর্ণ নারাজ। কেননা তাদের পরিষ্কার দাবি আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতির স্বত্বা কোন “উপ” বা “শাখা” নই। এছাড়া অন্য কোন জাতি থেকে আমাদের উৎপত্তি হয়েছে ইতিহাসেও এরকম কোন নজির নেই। বাংলাদেশ সরকার অনভিপ্রেত জাতির আগে “উপ” উপাদি বসিয়ে নিম্ন মনমানসিকতার নজির স্থাপন করেছে। অথচ সরকার এখনো উৎকৃষ্ট মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারে ত্রিপুরা জাতি, চাকমা জাতি, মারমা জাতি সহ অন্যান্য জাতিদের সংবিধানে সুষ্পষ্ঠভাবে স্বীকৃতি দিয়ে।
    অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তারা অনেকে নিজেদের সম্মিলিতভাবে জুম্মজাতি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আদি জাতিদের সকল পূর্বপুরুষরা পাহাড়ে জুম চাষাবাদ করেই জীবন জীবিকা করেছেন। তাই তারা সেই অর্থে জুম্ম। আরো উল্লেখ্য বহির্বিশ্বে অনেক দেশের মিডিয়া পাহাড়ে বসবাসরত আদি বাসিন্দাদের অনেক আগ থেকে জুম্ম (Jumma) হিসেবে পরিগণিত করে আসছে। ইউরোপে ফ্রান্স মিডিয়া তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    অনেক লেখক ও শিক্ষিত ভাবধারার মানুষ সাদাচোখে “আদিবাসী” শব্দটা মনে করেন একটা মানবাধিকার ধারণা। এটা কোন জাতির মুক্তির ক্ষেত্রে রাজৈনতিক অবিধা হতে পারেনা। তদ্রুপ অনেকের মত আবার সম্মিলিত জাতির মুক্তিতে আদিবাসী বা ইংরেজি Indigenous শব্দটি পার্বত্য চট্টগ্রামে এথনিক জাতিদের কোন বাঁধা নয়। বরং তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেতে সহজ হবে। কারণ আন্তর্জাতিভাবে যেকোন দেশের আদি ও প্রান্তিক এথনিক জাতিদের সম্মিলিতভাবে Indigenous হিসেবে treat করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারসহ জনজীবনের মূলস্রোতের অধিকার সমন্বয় পাবার জন্য এই Indigenous পরিচিতিটা গ্রহন অবশ্যম্ভাবী গুরুত্বপূর্ণ । তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকার্য বিষয় বা প্লাটফর্ম থেকে অহেতুক বিচ্যুত হওয়ার কোন পদক্ষেপ নিলে অবস্থা হবে যেন আন্তর্জাতিক সমাজকে অস্বীকার করা। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম এথনিক জাতিসত্ত্বাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে স্বীকার করেই পরিপক্ব হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বলাবাহুল্য অবশ্য তার জন্য দরকার যথাযথ রাজনৈতিক আন্দোলন ও ন্যায়ত মুক্তির আকাঙ্খা ।
    এবারের ৯ আগষ্ট ২০২০ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের Theme হচ্ছে “আদিবাসী জীবন জীবিকার সংগ্রাম”। একটি জাতি স্বতন্ত্রভাবে মাথা উচু করে দাঁড়াতে জীবন জীবিকার স্বাতন্ত্র্যবোধ ও স্বকীয়তা অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে নজীর আছে স্বাতন্ত্রবোধ ও মেধা লালন করে অনেক জাতি খুব কম সময়ে বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইসরাইলের ইহুদি জাতি তার উদাহরণ।

    সর্বোপরি আদিবাসী নেতাদের ভাষ্য International Indigenous Peoples Day যথাযথ স্মরণ করা এথনিক প্রান্তিক ও আদি জাতিদের একটা বিশ্ব ঐক্য ধারণা সৃষ্টিতে অবদান রাখবে এবং তার সাথে সাথে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
    পরিশেষে সবাইকে International Day of the World’s Indigineous People’s -2020 এর অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

    লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী।

    বাংলাদেশ সময়: ১:৩৫ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০

    eurobarta24.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ