• <div id="fb-root"></div>
    <script async defer crossorigin="anonymous" src="https://connect.facebook.net/en_GB/sdk.js#xfbml=1&version=v4.0&appId=540142279515364&autoLogAppEvents=1"></script>
  • শিরোনাম

    ভ্রমণ কাহিনী

    সাত পাহাড়ের শহর

    ইয়াকুব আলী | ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৫২ এএম

    সাত পাহাড়ের শহর

    উঁচু আকাশ থেকে অনেক নিচুতে নেমে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের প্লেনটা হেলেদুলে চক্কর মারতে থাকে। নিচে বিপুল জলরাশি। সাগর যেন। অনুচ্চ বিশাল পাহাড়ের ঢালে কালচে সবুজ বৃক্ষরাজির ফাঁকে ফাঁকে মেরুন কালারের টালির ছাদের ঘরবাড়ি। বিমানবন্দরের টারমাক থেকে অদূরে মাঝারি সাইজের আমগাছ। নভেম্বর মাসেই গুটি গুটি আম দুলছে। আবার মুকুলও এসেছে। ঘাসগুলোও গাঢ় সবুজ। মাটি লালচে। খুবই উর্বর মনে হয়। জাফর ভাইকে বলি–বেগুন চাষের জন্য উত্তম জমি। কদিন আগে রোজার সময়ে ঢাকার বাজারে বেগুন ১০০ টাকা কেজি হয়েছিল। ছবির মতো সুন্দর জায়গা। শহর এনটেবি। আমরা পোঁছে গেছি উগান্ডায়। এনটেবি এয়ারপোর্ট। অর্ডিনারি বিমানবন্দর। নিরাপত্তা ব্যবস্থা তথা কড়াকড়ির ক্ষেত্রে অনেক শিথিলতা। বাইরের রাস্তা থেকে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হ্যাঙ্গারে দেখা যায় সারি সারি বিমান।

    এয়ারপোর্ট থেকে রাজধানী শহর কাম্পালা প্রায় ৪০ কিলোমিটার। আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়িতে এনটেবি থেকে রওয়ানা হই কাম্পালার উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ডানে বাঁক নেয়ার পর আবার সেই দিগন্ত বিস্তারী জলরাশি। প্রটোকল অ্যাসিস্ট্যান্ট জানায় এটি লেক ভিক্টোরিয়া। নিউইয়র্কের ম্যানহাট্টান থেকে ক’দিন আগে কেনা সনি ডিজিটাল ক্যামেরায় ভিডিও করি অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য। মনে হচ্ছিল দূরে জলরাশি ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। পৃথিবী গোল বলেই কি না! মন চাইছিল গাড়ি থামিয়ে ওখানেই কতক্ষণ অবস্থান করি।

    রাস্তা তেমন ভালো না। আমাদের ইন্টার-ডিস্ট্রিক্ট সড়কগুলোর মতোই। দুই লেনের হাইওয়ে । গাড়ির তেমন চাপ নেই। রাস্তার পাশে ঝুপড়ির মত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে গরু-বাছুরও হেঁটে চলে। ক’দিন আগে ইউটিউবে দেখলাম এয়ারপোর্ট থেকে সিটি সেন্টার পর্যন্ত অত্যাধুনিক ফোর লেন এক্সপ্রেস ওয়ে তৈরি হয়েছে।

    আমাদের থাকার ব্যবস্থা ‘হোটেল আফ্রিকানা’তে। আফ্রিকার হোটেল চেইন। এ নামে আরো অনেক আফ্রিকান শহরে হোটেল আছে। ফোর স্টার পুরাতন হোটেল। সুইমিংপুল, জিমসহ সবই আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল লনের ওপর মেকশিফট রেস্তোরাঁ । সুইমিংপুলের পাশে। ঢাকার সোনারগাঁ হোটেলে উইন্টার গার্ডেন এর মত। রেস্তোরাঁর পাশে দু’একটা কলাগাছ। গাছে পাকা কলার কাঁদি ঝুলছে। অসাধারণ দৃশ্য। বুফে ব্রেকফাস্টে অনেক আইটেম থাকলেও তখনও সেভাবে বিদেশি খাবার-দাবার চিনতাম না। সঙ্গেই ছিলেন মসয়ূদ মান্নান স্যার ( তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মহাপরিচালক এখন সিনিয়র রাষ্ট্রদূত)। অচেনা পরিবেশে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তিনি বিশেষ সমাজদার। স্যারের দেখাদেখি ডিমসিদ্ধ, পাউরুটি, ফ্রেস দুধে ভিজিয়ে কর্নফ্লেক্স, পেস্ট্রি,ফ্রুটজুস এমনভাবে খেয়ে নিতাম যাতে দুপুরবেলা কিছু না খেয়েও দিব্যি দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। স্যার বলেন, ‘চুপ চাপ, যত পার খেয়ে নাও, দেশে দুধের যা দাম!’

    কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন। কমনওয়েলথ হেড অফ গভার্নমেন্টস মিটিং (চোগাম)। সিডরের তাণ্ডবের কারণে যাত্রার দুই দিন আগে ভ্রমন বাতিল করেন বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। ফলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীই বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আবাসন হয় সম্মেলনকে উদ্দেশ্য করে নির্মিত ‘কমনওয়েলথ মুনিউনিও রিসোর্টে’। সন্ধ্যার পর দেখা করতে গেলে স্যার বলেন, এটি সেভেন স্টার হোটল, যদিও পরে জেনেছি এটি ফাইভস্টার রিসোর্ট। সত্যিই গ্রেট লোকেশন। লেক ভিক্টোরিয়ার পাড়ে নির্মিত। রুমের শান-শওকত দেখে বিস্ময়াভিভূত হই।

    সম্মেলনস্থল হোটেল শেরাটন, কাম্পালা। প্ল্যানারিতে বসার চেয়ে আমার বাইরেই বেশি ভালো লাগে। পাইনআপেল,অরেঞ্জ ও পেসন ফ্রুট জুসের বড় বড় জার। যত খুশি খাও। একটু পরপর জুস খাই। চা খাই। দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা ওখানেই। কিন্তু খাবার দেখে পছন্দ হয় না। বিরানির মত কিছু ছিল। চিকেন আইটেম ছিল,তবে চিকেন সবসময়ই আমার অপছন্দের। কিছু সালাদ খাই। পেস্ট্রি খাই। এইসব।

    শহরটাতে গাছগাছালি ভালোই আছে। আফ্রিকার ঘন অরণ্য না থাকলেও দেখেই বোঝা যায় এটি আফ্রিকান শহর। হোটেলের পাশেই ছাতিম গাছের মতো কিছু গাছ। ডালে ভাব নিয়ে বসে আছে অনেক শকুনসহ বড় বড় পাখি। বহু বছর পর শকুন দেখি। ছোটবেলায় আমাদের পাড়ার বিশাল শিমুল গাছটায় শকুন বসত। উগান্ডা নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশ । ফলে আম-কাঁঠালসহ নানা ফল সারা বছরই পাওয়া যায়। একই গাছে একই সাথে পাকা আম আবার আমের নতুন মুকুল। কাঠালও প্রায় সারা বছর। আল্লাহর কি কুদরত। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ও একই রকম। ব্রুনাইয়ে আমার বাসায় এরকম একটি আমগাছ ছিল। কাঁঠালও হত বছরে দুইবার।

    শুনেছি পশ্চিমারা ইহুদিদের বসবাসের জন্য উগান্ডাকে ফিলিস্তিনের বিকল্প হিসেবে বেছে রেখেছিল। কোন কারণে যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিদের জন্য বাসভূমি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলে সুফলা এই দেশটিই হবে ইহুদি রাষ্টে্র বিকল্প ভূখণ্ড। উল্লেখ্য, দেশটির জনসংখ্যার ৮৫ ভাগ খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ।

    সন্ধ্যায় কেন জানি ধূম্রপাণের নেশা চাপে। কয়েক বছর হল সিগারেট ছেড়েছি। একটা সিগারেট কিনতে হোটেল কম্পাউন্ডের বাইরে বেরোই। দোকানে গিয়ে দেখি আমাদের দেশের মতো এক- দুই শলা করে সিগারেট বিক্রি হয় না। বাধ্য হয়েই ম্যাচসহ পুরো এক প্যাকেট মার্লবরো কিনি। হোটেলে ঢোকার সময়ে দেখি এদিক ওদিক প্রমোদবালাদের খালারা ভিড় করেছে। ‘স্যার, নিড গার্ল? হট, সেক্সি গার্ল? ‘নো নিড’ বলে দ্রুতপায়ে হোটেল চত্বরে ঢুকে পড়ি। উল্লেখ্য, এক সময় উগান্ডা ছিল এইডস এর খনি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে উগান্ডার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ ছিল বলে জানা যায়। তবে মহামারী থেকে উত্তরণে উগান্ডা ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

    আমাদের রাতে খাবারের জন্য হোটেল আফ্রিকানার নিকটেই একটি রেস্তোরাঁ ঠিক করে দিয়েছিল আমাদের হোস্ট কেনিয়ার নাইরোবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। হাইকমিশনকে সহযোগিতা করার জন্য ছিলেন কাম্পালায় কর্মরত এক প্রবাসী বাংলাদেশী। উগান্ডাতে তখন মোট ১৭ জন বাংলাদেশী কাজ করতো। এই ভদ্রলোক নোয়াখালীর। নামটা এখন আর মনে নাই । ওদের ঠিক করা রেস্তোরাঁটি নামে চাইনিজ রেস্তোরাঁ। বাস্তবে না চাইনিজ। না আফ্রিকান। চেয়েছিলাম সাদা ভাত। দেয়া হয় তেলে ভাজা খুদের ভাত। প্রথম দিন সন্ধ্যায় আমাদের খেতে দেয়া হয় বিশাল একটি ফ্রায়েড তেলাপিয়া। লেক ভিক্টোরিয়ার তেলাপিয়া। যতদূর মনে পড়ে মস্ময়ূদ মান্নান স্যার, সাঈদা মুনা ম্যাডাম, মাহফুজুর রহমান স্যার, সামিনা নাজ ম্যাডাম, জাফর রাজা চৌধুরী (জাফর ভাই) সহ সবাই মিলে বিশাল আকৃতির ফ্লায়েড তেলাপিয়াটি খাই। উল্লেখ্য,গত শতাব্দীর আশির দশকে তেলাপিয়া আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছে।

    সাইটসিইং এর অংশ হিসেবে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় জিনজা এলাকায়। এলাকাটি ‘নীল নদের উৎসভূমি ‘ (সোর্সেস অব দ্য নাইল) হিসেবে পরিচিত। রাজধানী কাম্পালা হতে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পূর্বে। রাস্তার দুপাশে পাহাড়-লেক-বনভূমির অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে গড়েছেন। ঝাঁক ঝাঁক সাদা হংস-বলাকা। লেকের পানি থেকে শ্বেত বকেদের মেঘমুক্ত আকাশে উড়াল দেয়ার দৃশ্যটি অজাগতিক মনে হয়। আকাশে তৈরি হয় বকের মালা। ন্যাচারাল ফর্মেশন কি জিনিস না দেখলে বোঝা যাবে না। এরকম দৃশ্য দেখার জন্য বারবার যেতে ইচ্ছে করে উগান্ডায়। ভেন্যুতে যাওয়ার পর প্রতিনিধিদলের সম্মানে উন্মুক্ত স্থানে নৃত্যগীত পরিবেশন করে স্থানীয় উপজাতীয়রা। নৌকা প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ ছিল বলে আমাদের ভাগ্যে ছিল না। অথবা ভাগ্যে ছিল না বলেই আবহাওয়া খারাপ ছিল। কিন্তু যতদূর চোখ গেছে তাতে এ নদীর সোর্স্ সত্যিই রহস্যময় মনে হয়েছে। হাদিসে নাকি আছে: দজলা, ফোরাতসহ (ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস) নীল নদের উৎস বেহেশতে। হতেই পারে। অঞ্চলটি আবার নিরক্ষীয় এলাকায়। সেটিও তো প্রকৃতির আরেক ধাঁধাঁ। এখানে লোকজন সার্টিফিকেট বিক্রি করে। সার্টিফিকেটে লেখা থাকে যে অমুক ব্যক্তি এত তারিখে অমুক সময়ে নিরক্ষরেক্ষা অতিক্রম করে উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে গমন করেছেন!

    সাতটি পাহাড়ের ওপর শহর কাম্পালা শহরের গোড়াপত্তন হলেও এখন তা অনেক বিস্তৃত। ওল্ড কাম্পালা হিল, কিবুলি হিল বেশ নামকরা। পুরো শহরের ১৫% ভূমিই নাকি ছড়া, নালা, পাহাড়ী খাল বা ড্রেন তথা জলা। শহরের পানি গিয়ে পড়ে লেক ভিক্টোরিয়ায়। সেখান থেকে নীল নদে। চার পাঁচটি দেশ পার হয়ে এই পানি গড়ায় ভূমধ্যসাগরে। ছয় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা নীলনদ পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী।

    সম্মেলনের শেষের দিকে একদিন হাইকমিশনার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সম্মানে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন শেরাটনে। ভোজে পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন স্যার সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। ম্যাডাম তখন কর কমিশনার ও এনবিআরের মেম্বার। এক পর্যায়ে ম্যাডাম জানতে চান আচ্ছা, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত কত দূরে? আমাদের সঙ্গে সফরকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চটপটে উত্তর দেন।’ ম্যাডাম, এইতো এখান থেকে ঘন্টা তিনেকের ড্রাইভ’। শুনে বিস্মিত হই। অন্যরাও মুচকি হাসতে থাকেন। কয়েক সেকেন্ড পর তৌহিদ হোসেন স্যার চোখ তুলে বলেন, কি বললা? ভিক্টোরিয়া ফলস এখান থেকে আরো তিনটা দেশ পার হওয়ার পর। সড়কপথে দুইদিন বললে উত্তর কাছাকাছি হতো। উল্লেখ্য, জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়ার সীমান্তে জাম্বেসি নদীতে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আফ্রিকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। দেড় কিলোমিটার মত প্রশস্ত এটি। ১০০ মিটার উঁচু থেকে পানি পড়ে। পঞ্চাশ কিলো দূর থেকে এতে দৃষ্টিগোচর হয়। ৪০ কিলো দূর থেকে জলপতনের শব্দ শোনা যায়।

    আমাদের প্রটোকল অ্যাসিস্ট্যান্টই আমাদের গাইড। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। নাম ইউসুফ। মুসলিম তরুণ। হজ করেছেন। মসয়ূদ মান্নান স্যার ও জাফর ভাইয়ের সঙ্গে যাই কিবুলি পাহাড়ে কিবুলি মসজিদ দেখতে। হোটেল থেকে অদূরেই কিবুলি পাহাড়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। মুসলমানরা ভালো আছে বলে মনে হয়নি। দেশটির জনসংখ্যার ১৪ পার্সেন্ট মুসলিম। মজার ব্যাপার হলো উগান্ডা ওআইসির সদস্য। কিবুলি পাহাড় এলাকার নোংরা পরিবেশ, দোকানপাটে দারিদ্র্যের ছাপ, অধিবাসীদের মলিন পোষাক, রেস্তোরায় খাবার দাবার দেখে এমনটি মনে হয়েছে। পাহাড়ের শীর্ষে মসজিদ। পাহাড়ি স্লপি রোড পেরিয়ে গাড়ি নিয়ে মসজিদে যাওয়া যায়। সবুজ গম্বুজের মসজিদটি দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। সুন্দর লোকেশনে মসজিদ তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোন তহবিল আছে বলে মনে হয় নি। অজু করে আছরের দুই রাকাত কছর নামায পড়ে নিই। মসজিদে কোন ফ্যান নেই। অবশ্য না হলেও চলে কারণ নিরক্ষীয় মালভূমির দেশে পাহাড়ের শীর্ষে সব সময় চিরবসন্ত বিরাজ করে। ফলে না গরম। না শীত। নামায পড়ে বের হওয়ার পর মসজিদের খাদেম আমাদের সঙ্গে আলাপ করেন। মসজিদের জন্য অনুদান চান। জাফর ভাই মুরুব্বি মসয়ূদ মান্নান স্যারকে দেখিয়ে দেন। বলেন, এম্বাসেডার। রিচ ম্যান!

    পরদিন আমাদের সঙ্গী একজন সিনিয়র কলিগ ড্রাইভারের কাছে নাইটক্লাব কোথায় আছে তা জানতে চান। ড্রাইভার জানায় হোটেল থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই। তিনি তাঁকে রাস্তাটা চিনিয়ে দিতে বলেন। জায়গামতো পৌঁছে সেখান থেকে ক্লাব খোলার সময়সূচি, এন্ট্রি ফি ইত্যাদি জেনে নেন। যাব কি না ভাবছিলাম। শেষপর্যন্ত ‘দেখে রাখা ভালো, অভিজ্ঞতা তো হবে’ এ রকম কৌতূহল থেকেই যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করি।

    জীবনে এই প্রথম নাইটক্লাবে প্রবেশ। নাইটক্লাবের আলোতে সাদাকে আরো সাদা দেখায়। পরনে আমার সাদা শার্টটা ময়লা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্লাবে ওটাকেই সাদার চেয়েও বেশি সাদা মনে হচ্ছিল। হাই ভলিউম মিউজিকের সাথে ওদের নাচানাচি খারাপ লাগে নি। ভেতরে বিক্রি হয় বিয়ারসহ বিভিন্ন হার্ডড্রিংক। আমার সঙ্গীরা বিয়ার খেয়ে নেন। নাইটক্লাবকে আমার কাছে এমন অমার্জিত কিছু মনে হয় নি। এ রকম অবস্থা তো অনেক জায়গায়ই দেখেছি। টয়লেটে গিয়ে দেখি এক জায়গায় ছোট্ট সাইনে লেখা ‘কনডম ডিসপোজার’। বুঝলাম এখানে অনেক সময় অনেক কাপলই বেসামাল হয়ে পড়েন বলেই পাকা ব্যবস্থা। ফেরার পথে সিনিয়র স্যার দার্শনিক তত্ত্ব দেন: সারাদিন খাটা খাটুনির পর একটু রিলাক্সের জন্যই এসব জায়গায় মানুষ আসে। যুক্তি খারাপ না! আমি বলি খাটুনির পর না বাসায় যাবে, এরকম জায়গায় কেন? স্যার বলেন, আরো বয়স হোক তারপর বুঝবা। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন বিদেশ অবস্থান ছাড়াও ১৫-১৬টি দেশ ভ্রমণের পর একযুগ পার হলেও এখনো বুঝে আসেনি।

    ওখানকার চামড়া শিল্প বিখ্যাত। দেশটিতে বন্যপ্রাণী প্রচুর। উগান্ডার সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হয় কমনওয়েলথ সম্মেলনের লোগো খচিত চামড়ার ব্যাগ। লেডিরা ব্যবহার করতে পারে। তাছাড়া টি ব্যাগের প্যাকেট। উগান্ডার কফি, চা, কোকো, বিন, ফুল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। আমাদের প্রতিনিধি দলের প্রধানকে দেয়া হয় ব্ল্যাকবেরি মোবাইল সেট ও চামড়ার তৈরি লাক্সারি ব্যাগ। ব্ল্যাকবেরি তখন নতুন সেনসেশন। এইডস, গৃহযুদ্ধ, স্বৈরশাসকদের লুটপাট ও দুর্নীতি অর্থনীতিকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের আকর বিধাতার অপরূপ সৃষ্টি এই দেশ। অথচ দেশটির লোকজন খাবার পায় না।

    উগান্ডা থেকে ফেরার পথে যাওয়ার কথা ছিল কেনিয়ার নাইরোবিতে। প্রধান উপদেষ্টা না থাকায় আমাদের কেনিয়া সফর বাতিল হয়। দুবাই হয়ে ৬-৭দিন পর দেশে ফিরে দেখি বেইলি স্কোয়ারে আমার সবজি বাগানে কুমড়া গাছটি অনেক বড় হয়েছে। হলুদ ফুলে ভরে গেছে। পাতার নিচে খুঁজে পাই একটি প্রমাণ সাইজের চালকুমড়া। তার ১৫ দিন পর আমাদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়।

    (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কার্যকালে ২০০৭ সালের নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সফরসঙ্গী হিসেবে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন যোগ দিতে উগান্ডা সফর করি। স্মৃতির পাতা থেকে…….)

    লেখক: পরিচালক, গণ যোগাযোগ বিভাগ, তথ্য মন্ত্রনালয়।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১