• শিরোনাম

    সেফটি ফার্স্ট নয়, বলুন মানি ফার্স্ট

    হাসিবুল হাসান হাসিব | রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 185 বার

    সেফটি ফার্স্ট নয়, বলুন মানি ফার্স্ট

    করোনা ভাইরাস সংক্রমনের বিষয়ে একটা তথ্য ব্যাপকভাবে চালু আছে। সেটা হচ্ছে এই ভাইরাসটি বাচ্চাদের দ্বারা খুব বেশি সংক্রমিত হয় না। আর এই তথ্যকে পুঁজি করেই ইউরোপ আমেরিকাসহ সারা পৃথিবীব্যাপী বাচ্চাদের স্কুল খুলে দেওয়ার ব্যাপক তোরজোড় শুরু হয়েছে। কিন্তু আসলে বাস্তবতাটা কি?

    গত ৭/৮ মাসে নতুন এই ভাইরাসটি নিয়ে বিস্তর গবেষনা চলছে, আরো চলতে থাকবে। ভাইরাসটির বৈশিষ্ট, আচরন, সংক্রমনের হার, গতি-প্রকৃতি, সংক্রমণের উপর পরিবেশ-আবহাওয়া-জলবায়ুর প্রভাব ইত্যাদি নানা বিষয়ে নানা তথ্য বের হয়ে আসছে। পুরোনো তথ্য বাতিল হচ্ছে, নতুন তথ্য যোগ হচ্ছে। মোট কথা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে করোনা ভাইরাস একটা “ডেভেলপিং স্টোরি”। কোনো একটা নতুন বিষয় গবেষনার মাধ্যমে সঠিকভাবে জানার জন্য ৭/৮ মাস সময় খুবই কম সময়। কাজেই করোনা ভাইরাস নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষনার মাধ্যমে যে তথ্যগুলো বের হয়ে আসছে তার সবগুলোকেই ডেফিনিটিভ মনে করার মতো পর্যাপ্ত গবেষনা এখনো হয়নি বললেই চলে।

    একথা সত্য যে বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে বাচ্চাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক কম অথবা বাচ্চারা আক্রান্ত হলেও বড়দের মতো মারাত্বকভাবে অসুস্থ্য হয় না অথবা বাচ্চদের মাধ্যমে এই ভাইরাসটি তেমন ছড়ায় না। আবার অনেক স্টাডিতেই এসবের একেবারে বিপরীত চিত্র দেখা না গেলেও অন্তত এটা দেখা গেছে যে বাচ্চাদের মাধ্যমেও এই ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। সাউথ কোরিয়াতে এরকম স্টাডি আছে ভাইরাসটি বড়দের মতোই বাচ্চাদের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। ইতালীতে একটা স্টাডিতে দেখা গেছে ১৫ বছরের কম বয়সীদের মাধ্যমে ভাইরাসটি তুলনামুলকভাবে বেশি ছড়াতে পারে। আবার কোন কোন স্টাডিতে দেখা গেছে বাচ্চারা এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলে তাদের মধ্যে তীব্র কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। আর একারণে বাচ্চাদের দ্বারা ভাইরাসটি ছড়ানোর ঝুঁকি তুলনামুলকভাবে বেশি। আবার যেহেতু লক্ষণ প্রকাশ করে না— হাঁচি কাশি কম দেয়, সুতরাং বাচ্চাদের থেকে ছড়ানোর আশঙ্কা কম। আবার কোন স্টাডিতে দেখা গেছে আক্রান্ত হওয়ার পর ৫ বছরের কম বাচ্চাদের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ বড়দের শরীরের চেয়েও বেশি থাকে।

    এতো অনিশ্চয়তার পরেও খোদ আমেরিকাতেই দেখা গেছে বাচ্চাদের মধ্যে করোনা ভাইরাস কেইস বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমেরিকান একাডেমী অব পেডিয়াট্রিক্স জানাচ্ছে জুলাই ৯ থেকে অগাস্ট ১৩— এই একমাসে আমেরিকাতে বাচ্চাদের করোনা ভাইরাস কেইস দুই লাখ থেকে বেড়ে চার লাখে পৌঁছেছে। কাজেই কোন তথ্যই এখন পর্যন্তও নিশ্চিত না। আসলে মূল প্রশ্নটা হচ্ছে বাচ্চারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে কি না? এবং বাচ্চাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায় কি না? এই দুইটি প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর হচ্ছে — হ্যাঁ। বাচ্চারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি বড়দের মধ্যেও ছড়াতে পারে। এখন কম না বেশি সেটা ভিন্ন বিষয়।

    তাহলে এতো অনিশ্চয়তার মধ্যে দুটি নিশ্চিত উত্তর জানা সত্ত্বেও কেন আমরা আমদের বাচ্চাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে পাঠাচ্ছি? এর কারন একটাই। সেটা হচ্ছে অর্থনৈতিক। ইউরোপ আমেরিকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মা-বাবা দিনের বেলায় ওয়ার্কিং টাইমে বাচ্চাদের লালন-পালনের জন্য এখানকার স্কুল সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল। বাচ্চা স্কুলে থাকলে মা-বাবা দুজনেই কাজ করতে সক্ষম হয়। মহামারীর প্রথম দিকে যখন অনলাইন স্কুলিং শুরু হল, তখন মা-বাবাদেরও ওয়ার্কিং ফ্রম হোম শুরু হল। কিন্তু দেখা গেল অনলাইন স্কুলিং হলেও বিষয়টা আসলে হোম স্কুলিং-এরই আরেক রূপ। অনলাইন স্কুলিং-এ অনেক সময়ই মা-বাবাকে বাচ্চার পড়াশোনায় সাহায্য করতে হয়, যেটা “ওয়ার্কিং ফ্রম হোম“ মা-বাবা’র জন্য স্ট্রেসফুল। তারা দেখল তাদেরকে একই সময়ে দুটো ফুলটাইম জব করতে হচ্ছে। যার একটা পেইড জব। আরেকটা আনপেইড চাইল্ড কেয়ার জব। এটা একদিক থেকে তাদের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতির স্বরূপ। আরেকদিকে থেকে অতিরিক্ত মানুষিক চাপ। এখন স্কুল যদি ওপেন না হয় তাহলে মা-বাবা দুজনের একজনকে অবশ্যই কাজ ছেড়ে দিতে হবে (এক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে মা-কে কাজ ছেড়ে দিতে হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না)। এতে মা-বাবা’র মানুষিক চাপ বেড়ে যাবে। ফ্যামিলি ইনকাম কমে যাবে। যার পরিণতিতে দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পরবে। এই অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানোর জন্যই আমেরিকান একাডেমী অব পেডিয়াট্রিক্স, ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন, ন্যাশনাল একাডেমী অব সাইন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং, এন্ড মেডিসিনসহ উন্নত বিশ্বের তাবৎ বড় বড় অর্গানাইজেশন বাচ্চাদের স্কুল খুলে দেওয়ার জন্য ক্রমাগত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
    তাহলে কি দেখা যাচ্ছে? মূল বিষয়টা কি? মূল বিষয়টা হচ্ছে অর্থনৈতিক। “বাচ্চারা করোনা ভাইরাস ছড়ায় না” – গবেষণার এই অনিশ্চিত তথ্যটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আমরা অভিভাবক সহ প্রতিটি দেশের হর্তাকর্তারা আমাদের প্রাণপ্রিয় বাচ্চাদেরকে কি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি না? একই সাথে নিজেরাও কি ঝুঁকির মধ্যে পরতে যাচ্ছি না?
    আসলে মুখে আমরা যতই “সেফটি ফার্স্ট, সেফটি ফার্স্ট” বলে গলা ফাটাই না কেন, মননে আমরা “মানি ফার্স্ট”-এ বিশ্বাস করি। ব্যাক্তিগত, সামাজিক, এবং রাষ্ট্রীয়ভাবেও এটাই আমাদের লাইন অব থিঙ্কিং। এটাই আমাদের পলিসি। এমনকি সেটা যদি আমাদের বাচ্চাদের নিরাপত্তাকে কম্প্রোমাইজ করেও হয়, তবুও। হ্যাপি ব্যাক টু স্কুল!!

    লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক।

    বাংলাদেশ সময়: ৭:২৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২০

    eurobarta24.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ