• শিরোনাম

    ৫১ বছরের নুরউদ্দিনের রেকর্ড

    ৩৩ বার পরীক্ষা দেয়ার পর ম্যাট্রিকে সাফল্য

    ডেস্ক | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২০ | পড়া হয়েছে 268 বার

    ৩৩ বার পরীক্ষা দেয়ার পর ম্যাট্রিকে সাফল্য

    ধন্যি ছেলের অধ্যাবসায়! উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে, ঘায়েল হয়ে থামল শেষে। ‘কংসরাজের বংশধর’ ছিল গঙ্গারাম। কিন্তু ‘মান’ রাখতে পারেনি এমন নামজাদা বংশের! টানা ১৯টি বার পরীক্ষায় বসেও ম্যাট্রিক পাশের শিকে ছেঁড়েনি তার কপালে। তবে তার জেদ ছিল প্রশ্নাতীত। অধ্যাবসায়ে ছিল তার অদম্য চেষ্টা। আর তারই দৌলতে বোধহয় গঙ্গারামের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন সুকুমার রায়। গঙ্গারাম হয়ে উঠেছিল ‘আবোল-তাবোল’-এর ‘সৎপাত্র’— ‘মন্দ নয় সে পাত্র ভালো’!
    হায়দরাবাদের মহম্মদ নুরউদ্দিনও ‘মন্দ’ নন। প্রৌঢ় হলে কী হবে, অন্তত গঙ্গারামের রেকর্ড ভেঙে তিনি এখন ‘ভালো’ ছাত্র। তেলেঙ্গানা রাজ্যের ‘কৃতী’ ছাত্রও বটে! টানা ৩৩ বারের চেষ্টা। অবশেষে পাশ দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষায়। আর এই সাফল্যের পিছনে মারণ কোভিডের কাছেই কৃতজ্ঞ নুর। তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি—‘কোভিডের জন্যই এ যাত্রায় উতরে গেলাম! আমার কাছে এই মহামারী আশীর্বাদ।’ তবে নুরউদ্দিনের স্বীকারোক্তি যাই হোক, নেট-নাগরিকরা তাঁর পরিশ্রমকে কুর্নিশ করতে এতটুকুও কুণ্ঠিত হননি। বলেছেন, ‘অদম্য জেদের সঙ্গে লক্ষ্যকে অবিচল রাখলে ভাগ্যও সহায় হয়। নুরউদ্দিনের কৃতকার্য সেই শিক্ষাই দিল আমাদের।’
    নুরউদ্দিনের বয়স এখন একান্ন। প্রৌঢ়ত্ব উঁকি মারছে তাঁর চামড়ার ভাঁজে। তবে মন-মেজাজে তিনি তরতাজা। মুখে গালভরা হাসি। এতবারের পরীক্ষার্থী হয়েও তাঁর সংকোচ নেই। না আছে মনে কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। তাঁকে ছুঁতে পারেনি অবসাদও। উল্টে যুদ্ধজয়ের গর্বে সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনে এসেছেন। মেলে ধরেছেন তাঁর শতচ্ছিন্ন অ্যাডমিট। এখন অবশ্য সেই অ্যাডমিট তাঁর কাছে শুধু বয়সের প্রমাণপত্র। এবার নুরউদ্দিনের হাতে এসে যাবে টাটকা মার্কশিট। তেলেঙ্গানা সরকারের সিদ্ধান্তে তিনি মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। লড়াই শুরু সেই ১৯৮৭ সাল থেকে। প্রতি বছর বোর্ডের পরীক্ষা হয়েছে। নুরউদ্দিনও পিচবোর্ড বগলদাবা করে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকেছেন। পরীক্ষা দিয়ে নাতির বয়সি ছাত্রদের সঙ্গে হাসিমুখে বেরিয়েও এসেছেন। তেত্রিশ বছর… পেরতে পারেননি কেবল দশম শ্রেণীর গণ্ডি। এবারও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু কোভিডের ধাক্কায় পরীক্ষা ভেস্তে যায় তেলেঙ্গানায়। মনমরা হয়ে পড়েছিলেন নুরউদ্দিন। এমন সময় রাজ্য সরকারের ঘোষণা— মহামারীর ক্রান্তিলগ্নে বোর্ড পরীক্ষার সমস্ত পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ। শোনামাত্র প্রথমে হকচকিয়ে যান নুরউদ্দিন। তারপর নিশ্চিত হয়েই পরিবারের সঙ্গে উৎসব-উদযাপনে মেতে ওঠেন তিনি।
    কীসের তাড়নায় এত জেদি নুরউদ্দিন? রাখঢাক না করে বলেই ফেললেন সুপ্ত ইচ্ছের কথা। ‘জানেন তো, আমাদের অভাবের সংসার। স্বপ্ন ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তাতে পরিবারেরও কিছুটা সুরাহা হবে। আর সেই লক্ষ্যপূরণ করতে হলে চাই সরকারি চাকরি। বাঁধা মাইনে। কাজ হারানোর ভয় নেই। মাস গেলে থোক টাকা ঘরে ঢুকবে। তাই যেনতেন প্রকারে ম্যাট্রিক পাশ করতে উঠেপড়ে লেগেছিলাম। কিন্তু বিধি বাম! মূর্তিমান বিভীষিকা হিসেবে হাজির হয় ইংরেজি। কোনওভাবেই বিষয়টিকে বাগে আনতে পারিনি আমি। একবার… দু’বার… তিনবার—ঘুরেফিরে ওই একটি জগদ্দল পাথরেই ঠোক্কর খেয়েছে আমার মনোবল। কিন্তু ভেঙে পড়িনি। যতবারই ফেল করেছি, ততবারই জেদ চেপে বসেছে।’
    হাল ছাড়েননি নুরউদ্দিন। পেটের তাগিদে একটা ছোটখাট চাকরি করতে হয় তাঁকে। কিন্তু নিয়ম মেনে পরীক্ষায় বসে গিয়েছেন তিনি। ইংরেজির বিরুদ্ধে যেন তাঁর একক জেহাদ। লক্ষ্য একটাই—টাচলাইন ছুঁতে হবে। পাশ করতে হবে। ‘সবুরে মেওয়া’র স্বাদ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সুকুমার রায়ের গঙ্গারাম। নুর অবশ্য সেই স্বাদ পেলেন। এবার কি চাকরির জন্য লাইন লাগাবেন সরকারি দপ্তরে? বয়স বোধহয় পেরিয়ে গিয়েছে!

    বাংলাদেশ সময়: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২০

    eurobarta24.com |

    আর্কাইভ